বাংলা সাহিত্য ও সমাজচিন্তার ইতিহাসে মহাশ্বেতা দেবী এক অনন্য নাম—একটি কণ্ঠস্বর, যা নিরব মানুষের হয়ে কথা বলেছে; একটি কলম, যা শোষণের অন্ধকারে আলো জ্বেলেছে; এবং একটি জীবন, যা সাহিত্য ও সংগ্রামকে একসূত্রে গেঁথে দিয়েছে। তিনি শুধু একজন কথাসাহিত্যিক নন, ছিলেন সময়ের বিবেক, সমাজের নৈতিক চেতনা ও নিপীড়িত মানুষের নির্ভীক সহযাত্রী।
১৯২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করে ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই পর্যন্ত বিস্তৃত তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত এক গভীর মানবিক অভিযাত্রা। আদিবাসী, দলিত, প্রান্তিক মানুষের যন্ত্রণা, বঞ্চনা ও প্রতিবাদের ভাষা তিনি নির্মাণ করেছিলেন সাহিত্যের মধ্য দিয়ে—যেখানে কল্পনা নয়, ছিল কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়ানো সত্য।
এই গ্রন্থ “দেবী মহাশ্বেতা” সেই অসামান্য জীবন ও কর্মযজ্ঞের একটি সংবেদনশীল দলিল। বিশিষ্ট সাহিত্যিক উমা সেনাপতি এই গ্রন্থে মহাশ্বেতা দেবীর জীবনপথকে অনুসরণ করেছেন পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকে শুরু করে সাহিত্যিক উত্থান, সমাজসেবামূলক সংগ্রাম, সাংবাদিকতা, অধ্যাপনা এবং সর্বোপরি একজন প্রতিবাদী মানবী হিসেবে তাঁর ভূমিকার আলোকে। ব্যক্তিগত জীবন, মানসিক দ্বন্দ্ব, ভালোবাসা, বেদনা ও সংগ্রামের সঙ্গে সঙ্গে ফুটে উঠেছে এক দৃঢ়চেতা নারীর সমাজদর্শন।
২০০৫ সালে প্রথম প্রকাশিত এই গ্রন্থটি মহাশ্বেতা দেবীর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে আরও পরিমার্জিত, তথ্যসমৃদ্ধ ও বিস্তৃত রূপে দ্বিতীয় সংস্করণ হিসেবে পাঠকের সামনে উপস্থিত হয়েছে। সংযোজিত হয়েছে নতুন তথ্য, মূল্যায়ন ও প্রাসঙ্গিক প্রসঙ্গ, যা গ্রন্থটিকে আরও সমকালীন ও গবেষণাসমৃদ্ধ করে তুলেছে।
গ্রন্থের অধ্যায়সমূহে পাঠক পাবেন তাঁর শৈশব-কৈশোর, শিক্ষা ও মানসগঠনের বিবরণ, সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিকতা, সমাজসেবার বাস্তব অভিজ্ঞতা, আদিবাসী আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা, এবং চুনি কোটালের মতো ঘটনায় তাঁর বিবেকী প্রতিবাদ। একই সঙ্গে সংকলিত হয়েছে তাঁর রচনাসমগ্রের পরিচয় ও জীবনপঞ্জি—যা গবেষক ও পাঠকের জন্য মূল্যবান দলিল।
মহাশ্বেতা দেবী কেবল সাহিত্যিক নন, তিনি এক নৈতিক অবস্থান। তাঁর কলম ছিল প্রতিবাদের হাতিয়ার, আর জীবন ছিল সেই কলমের সাক্ষ্য। এই গ্রন্থ সেই জীবনকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক আন্তরিক প্রয়াস।
এই মুখবন্ধের মাধ্যমে আমরা পাঠককে আমন্ত্রণ জানাই—একটি জীবনের নয়, একটি আন্দোলনের ভেতর প্রবেশ করতে; যেখানে সাহিত্য ও সমাজ একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে।